বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয়তাবাদী ও আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য প্রতীক ছিলেন অধ্যাপিকা রেহানা প্রধান। তিনি একাধারে একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) দ্বিতীয় সভাপতি হিসেবে দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন গড়ে উঠেছিল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহিরাগত শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের মধ্য দিয়ে।
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও সাবেক সভাপতি
মরহুমা অধ্যাপিকা রেহানা প্রধান
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
রেহানা প্রধান ১৯৫৫ সালের ২ মে বগুড়া জেলার মাটিডালি এলাকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সহিরউদ্দিন আকন্দ পেশায় একজন প্রতিযশ চিকিৎসক ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে রেহানা প্রধানের বড় ভাই শহীদ হন। শহীদ পরিবারের একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে রেহানা প্রধানের ধমনিতে জড়িয়ে ছিল দেশপ্রেমের চেতনা।
তিনি বগুড়ার ভাণ্ডারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
ছাত্ররাজনীতি ও রাজনৈতিক হাতেখড়ি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নকালেই রেহানা প্রধান তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদে তিনি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ত্যাগ করেন। অতঃপর “ছাত্রলীগ (প্রধান)” গঠনে জোরালো ভূমিকা রাখেন এবং এর মাধ্যমে সক্রিয় ছাত্ররাজনীতি পরিচালনা করেন। এই ছাত্ররাজনীতিই তাঁর পরবর্তী জীবনের আপসহীন ও সাহসী নেতৃত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন
১৯৭৮ সালে তিনি প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ শফিউল আলম প্রধানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রেহানা প্রধান পারিবারিক দায়িত্ব, মহান শিক্ষকতা এবং রাজনৈতিক কর্তব্য অত্যন্ত দক্ষতার সাথে একহাতে সামাল দিয়েছেন।
পরম ধার্মিক ও পরহেজগার এই মহীয়সী নারী জীবনে একাধিকবার পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন করেছেন।
শিক্ষকতা জীবন ও সমাজভাবনা
ছাত্রজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লালমাটিয়া মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ২০১০ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে কেবল সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞানের বিস্তারই ঘটাননি, বরং স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।
একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি সমাজ কাঠামোর বৈষম্য ও রাজনৈতিক পরাধীনতার বিষয়গুলোকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও দলীয় কর্মসূচিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
জাগপার নেতৃত্ব ও জাতীয় রাজনীতি
অধ্যাপিকা রেহানা প্রধান জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় কমিটির ১ নং সহ-সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আমৃত্যু তিনি দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে এবং স্বৈরতন্ত্র ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন।
২০১৭ সালের ২১ মে জাগপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব নেন অধ্যাপিকা রেহানা প্রধান। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর দলের বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি পূর্ণাঙ্গ সভাপতি হিসেবে জাগপার হাল ধরেন।
তাঁর এই দূরদর্শী নেতৃত্ব কেবল দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকেই বজায় রাখেনি, বরং তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ঐক্য সুসংহত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জোটের শীর্ষ রাজনীতিতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে রেহানা প্রধান দেশের বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রেখেছেন।
ইন্তেকাল
২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর, সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় আসাদগেটের নিজ বাসভবনে ৬৩ বছর বয়সে অধ্যাপিকা রেহানা প্রধান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডের বায়তুস সালাম জামে মসজিদে ওই দিনই বাদ মাগরিব মরহুমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে দলীয় ও পারিবারিক সিদ্ধান্তে ঢাকার বনানী কবরস্থানে স্বামী শফিউল আলম প্রধানের কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।